১৬ই ডিসেম্বর, বাঙালির জাতীয় জীবনে এক গৌরবোজ্জ্বল দিন। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ এবং ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশ। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা জানব বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান এবং বিজয় দিবসের তাৎপর্য সম্পর্কে বিস্তারিত।
মহান বিজয় দিবসের পটভূমি ও প্রেক্ষাপট
১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টি হলেও, পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) মানুষের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ ও বঞ্চনা থামেনি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়—সবকিছুই ছিল স্বাধীনতার একেকটি সোপান।
কিন্তু পাকিস্তানি জান্তারা ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে অপারেশন সার্চলাইটের নামে জঘন্যতম গণহত্যা শুরু করে। ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।
মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান ও মিত্রবাহিনী
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের অবদান অনস্বীকার্য। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অত্যাচারে প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশি ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। ভারত সরকার শুধুমাত্র এই বিপুল সংখ্যক শরণার্থীদের আশ্রয় ও খাবারই দেয়নি, বরং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করেছিল।
১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর বাংলাদেশ ও ভারত মিলে গঠন করে মিত্রবাহিনী। ৩রা ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারতের বিমানঘাঁটিতে হামলা চালালে ভারত সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং আমাদের অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী দিশেহারা হয়ে পড়ে। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কূটনৈতিক তৎপরতা এবং ভারতীয় জনগণের সমর্থন বাংলাদেশের বিজয়কে ত্বরান্বিত করতে বিশাল ভূমিকা রেখেছিল।
১৬ই ডিসেম্বরের চূড়ান্ত বিজয় এবং আত্মসমর্পণ
ডিসেম্বরের শুরু থেকেই পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটতে থাকে। ঢাকার দিকে অগ্রসর হতে থাকে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিুবাহিনী। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বিকেলে ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জন্ম হয় এক নতুন ইতিহাসের।
বিকালে ৪টা ৩১ মিনিটে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি ৯৩,০০০ সৈন্যসহ বিনাশর্তে যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। যৌথ বাহিনীর পক্ষে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। এভাবেই পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।
বর্তমান বাংলাদেশ ও আগামীর স্বপ্ন
আজকের বাংলাদেশ আর ১৯৭১ সালের তলাবিহীন ঝুড়ি নয়। বর্তমান সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। অবকাঠামগত উন্নয়ন, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল এবং কর্ণফুলী টানেলের মতো মেগা প্রজেক্টগুলো বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছে।
সরকারের বর্তমান লক্ষ্য হলো 'স্মার্ট বাংলাদেশ' গড়ে তোলা। যেখানে প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। বিজয় দিবসের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বর্তমান প্রজন্মকে দেশের ইতিহাস জানতে হবে এবং দেশগড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে।
উপসংহার
১৬ই ডিসেম্বর কেবল একটি দিন নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের ঠিকানা। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার নামই বাংলাদেশ। মহান বিজয় দিবসে সকল বীর শহীদদের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। আমাদের দায়িত্ব হলো, যে লক্ষ্য নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, সেই ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তোলা।

0 মন্তব্যসমূহ